মরু ও শুষ্ক অঞ্চলের কাঁটাযুক্ত একটি ঝোপজাতীয় উদ্ভিদ—গরকদ (الغَرْقَد)। সাধারণ একটি উদ্ভিদ হলেও ইসলামী ধর্মীয় সাহিত্যে এর একটি বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। কারণ, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি সহিহ হাদিসে কিয়ামতের পূর্ববর্তী একটি ঘটনার বর্ণনায় গরকদ গাছের নাম এসেছে।
হাদিসে কী বলা হয়েছে ?
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ মুসলিমের ২৯২২ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, শেষ সময়ে মুসলমান ও ইহুদিদের মধ্যে সংঘর্ষের একটি ঘটনার সময় কোনো ইহুদি পাথর বা গাছের আড়ালে আত্মগোপন করলে পাথর বা গাছ মুসলমানকে তার অবস্থান জানাবে। তবে গরকদ গাছ তা করবে না। হাদিসের শেষে গরকদকে ‘ইহুদিদের গাছ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—হাদিসে গরকদ গাছ কেটে ফেলার কোনো নির্দেশ নেই। তাই ‘রাসুল (সা.) গরকদ গাছ কাটার নির্দেশ দিয়েছেন’—এমন বক্তব্যকে সহিহ হাদিসের সরাসরি বক্তব্য হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়।
গরকদ আসলে কোন গাছ ?
আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞানে আরবি ‘গরকদ’-এর সঙ্গে Lycium গণের কিছু প্রজাতির সম্পর্ক দেখানো হয়। বিশেষ করে Lycium shawii-কে অনেক উদ্ভিদতাত্ত্বিক উৎসে গরকদ-সংশ্লিষ্ট উদ্ভিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে আরবি প্রচলিত নাম ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রজাতির মধ্যে সরাসরি এক-একটি সম্পর্ক নির্ধারণে কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে।
Kew-এর Plants of the World Online অনুযায়ী, Lycium shawii Solanaceae বা বেগুনজাতীয় পরিবারের একটি কাঁটাযুক্ত ঝোপ। এর স্বাভাবিক বিস্তৃতি মধ্যপ্রাচ্য, আরব উপদ্বীপ, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল এবং পশ্চিম ভারত পর্যন্ত।
দেখতে কেমন?
গরকদ-সংশ্লিষ্ট Lycium shawii সাধারণত বহু শাখাবিশিষ্ট কাঁটাযুক্ত ঝোপ।
বিভিন্ন উদ্ভিদতাত্ত্বিক বর্ণনায় এর উচ্চতা প্রায় ১ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত বলা হয়েছে। এর শাখায় কাঁটা থাকে, পাতাগুলো ছোট এবং ফুল সাধারণত হালকা বেগুনি থেকে সাদাটে রঙের হতে পারে। ফল ছোট, গোলাকার এবং লাল রঙের।
শুষ্ক ও মরু পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতার কারণে এ ধরনের উদ্ভিদ প্রতিকূল পরিবেশেও জন্মাতে পারে। Kew-এর তথ্য অনুযায়ী Lycium shawii মরুভূমি ও শুষ্ক ঝোপঝাড়পূর্ণ পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে।
শুধু ধর্মীয় পরিচিতিই কি এর বৈশিষ্ট্য ?
না। গরকদ-সংশ্লিষ্ট Lycium shawii উদ্ভিদ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয়ভাবে নানা কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
Kew-এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক তথ্যভান্ডারে এর পাতা খাদ্য হিসেবে এবং লোকজ চিকিৎসায় বিভিন্ন অংশ ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব ব্যবহারকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
‘ইহুদিরা বেশি করে গরকদ লাগায়’—কতটা সত্য ?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দাবি করা হয়, ইহুদিরা নাকি বিপুল পরিমাণে গরকদ গাছ লাগাচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ হাদিসের ঘটনার কারণে গাছটি সংরক্ষণ করছে। কিন্তু বর্তমানে ইহুদিরা পরিকল্পিতভাবে ব্যাপক হারে এই গাছ লাগাচ্ছে—এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।
এ ধরনের দাবি এবং সহিহ হাদিসে বর্ণিত বিষয়কে এক করে দেখা উচিত নয়। হাদিসে গরকদ সম্পর্কে একটি ভবিষ্যৎ ঘটনার বর্ণনা রয়েছে; বর্তমান সময়ে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম সম্পর্কে সেখানে কোনো বক্তব্য নেই।
কেন গরকদ নিয়ে এত কৌতূহল ?
গরকদকে ঘিরে মানুষের আগ্রহের প্রধান কারণ এর ধর্মীয় পরিচিতি। পৃথিবীর অসংখ্য উদ্ভিদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট গাছের নাম কিয়ামতের পূর্ববর্তী একটি ঘটনার বর্ণনায় আসায় মুসলিম সমাজে এটি স্বাভাবিকভাবেই আলোচিত হয়েছে।
তবে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি উদ্ভিদটির বাস্তব পরিচয় জানাও গুরুত্বপূর্ণ।
গরকদ কোনো কাল্পনিক বা রহস্যময় ‘অদৃশ্য’ উদ্ভিদ নয়; এর সঙ্গে সম্পর্কিত Lycium প্রজাতির উদ্ভিদ বাস্তবেই মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য শুষ্ক অঞ্চলে জন্মে। একই সঙ্গে কোন আধুনিক প্রজাতিকে হাদিসের ‘গরকদ’ বলা হবে—এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে অতিরিক্ত নিশ্চিত দাবি না করে সতর্ক অবস্থানে থাকাটাই উত্তম ।
শেষ কথা
গরকদ গাছ একই সঙ্গে ধর্মীয় বর্ণনা ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়। সহিহ মুসলিমে এর উল্লেখ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হাদিসের বক্তব্যকে বর্তমান রাজনৈতিক বা সামাজিক দাবির সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো :—হাদিসে গরকদ গাছ কাটার নির্দেশ নেই; আর বর্তমানে ইহুদিরা ব্যাপকভাবে এই গাছ রোপণ করছে—এমন দাবিরও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
ধর্মীয় সূত্রকে ধর্মীয় সূত্র হিসেবেই এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যকে বৈজ্ঞানিক তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করলে পাঠকের সামনে বিষয়টি আরও পরিষ্কার ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা সম্ভব।
তথ্যসূত্র:
১. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯২২।
২. Kew Science, Plants of the World Online, Lycium shawii.
লেখক ও পরিচালক : সিসিআরএসবিডি এবং প্রধান সম্পাদক
মন্তব্য করুন