চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজস্ব আহরণের গুরুত্ব বিবেচনায় কর সেবা প্রদান আরো সহজতর ও গতিশীল করার লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি চট্টগ্রাম কর অঞ্চলে প্রশাসনিক বিন্যাস সম্প্রসারিত করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গঠিত হয়েছে দুটি নবসৃষ্ট অঞ্চল— কর অঞ্চল-৫ এবং কর অঞ্চল-৬ ।
রাজস্ব প্রশাসনিক পরিধি বিস্তৃত করে করদাতাগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেয়া এবং রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির চমৎকার একটি উদ্দেশ্য নিয়ে এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সম্প্রতি পেশাগত কাজে শেখ মুজিব রোডস্থ ‘বনানী কমপ্লেক্স’-এর ৮ তলায় নিজ চোখে দেখা দৃশ্যের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট বুঝেছি যে, উপযুক্ত অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ছাড়া তড়িঘড়ি করে অফিস চালুর ফলে সেবাগ্রহীতা ও কর্মকর্তা-কর্মচারী উভয় পক্ষই চরম ভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনার শিকার হয়েছেন।
বনানী কমপ্লেক্সের ৮ তলায় পা পড়তেই যে বিষয়টি প্রথম চোখ স্পর্শ করেছে, তা হলো এক অভূতপূর্ব বিশৃঙ্খলা। সুবিশাল একটি ফ্লোরে কোনো প্রকার স্থায়ী বা অস্থায়ী পার্টিশন ছাড়া দুটি সম্পূর্ণ কর অঞ্চলের বিভিন্ন সার্কেলসমূহকে একত্রে জড়ো করা হয়েছে। একটি পেশাদার ও সংবেদনশীল সরকারি দপ্তরের পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত, তার ন্যূনতম প্রতিফলন এখানে দেখিনি।
খোলামেলা ও উন্মুক্ত ফ্লোরে গাদাগাদি করে বসানো হয়েছে টেবিল ও চেয়ার। অফিসের কর্মকর্তা, কর্মচারী, নথিপত্র এবং সেবা নিতে আসা শত শত মানুষের সমাগমে পুরো স্থানটি কোনো দাপ্তরিক কর্মস্থল না হয়ে রূপ নিয়েছে কাজির দেউড়ির জনাকীর্ণ মাছের বাজারে।

সরকারি কাজের জন্য যে ন্যূনতম গোপনীয়তা, নিস্তব্ধতা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা প্রয়োজন, তা এই খোলামেলা পরিবেশে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। স্থান সংকুলান না হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে, যা তাদের মানসিক চাপ বৃদ্ধির পাশাপাশি কাজের স্বাভাবিক গতিকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে।
একটি আদর্শ সরকারি দপ্তরে পদমর্যাদার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট কক্ষ বা ডেক্স বরাদ্দ থাকে, যাতে সেবাগ্রহিতা সহজে তার কাঙ্ক্ষিত কর্মকর্তা বা অফিস সহকারির স্থান চিহ্নিত করতে পারেন। কিন্তু বনানী কমপ্লেক্সের এই ফ্লোরে কে উপ-কর কমিশনার, কে সহকারী কর কমিশনার, কে প্রধান সহকারী কিংবা কে অফিস সহায়ক—তা দূর থেকে বোঝার উপায় নেই।
কোনো নেমপ্লেট, ডেক্স নম্বর বা সার্কেল নির্দেশক সাইনবোর্ড না থাকায় এক অদ্ভুত বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
নবসৃষ্ট এই দুটি অঞ্চলে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ও পদায়নকৃত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা অনেক। তাদের চেনা বা জানার সুযোগ আয়কর দাতা বা আয়কর আইনজীবিগণের নেই। ফলে একজন সেবাগ্রহীতাকে তার কাঙ্ক্ষিত ফাইল বা কর্মকর্তার সন্ধান পেতে প্রতি টেবিলে ঘুরে ঘুরে জিজ্ঞাসা করতে হয়।
এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীর মনোযোগ বিঘ্নিত হয় এবং সার্বিক সেবা প্রদান ব্যবস্থা একটি হযবরল বা লেজেগোবরে অবস্থায় রূপ নেয়। কাকতালীয়ভাবে পুরোনো কোনো সহকর্মী বা পরিচিত মুখ না থাকলে একজন সাধারণ সেবাগ্রহীতার পক্ষে সঠিক ডেস্কে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব।
জাতীয় অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজস্ব আহরণকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অপরিসীম। সরকারি আয়ের মূল চালিকাশক্তি যারা সরবরাহ করে, সেই আয়কর বিভাগের এমন জরাজীর্ণ ও মানবেতর দাপ্তরিক অবস্থা আসলেই হতাশাজনক।
একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতীক হওয়া উচিত তার রাজস্ব অবকাঠামো। কিন্তু বনানী কমপ্লেক্সের ৮ তলার এহেন দুরবস্থা কেবল রাজস্ব বিভাগের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করেনি, বরং কর্মকর্তা-কর্মচারীগণের আত্মমর্যাদা ও কর্মস্পৃহাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উপযুক্ত বাতাস, পর্যাপ্ত আলো এবং কাজের মতো স্বাস্থ্যকর পরিবেশ না থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
এই মানসিক ও শারীরিক অস্বস্তির কারণে তাদের দৈনন্দিন দাপ্তরিক দক্ষতা হ্রাস পাচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের রাজস্ব আহরণের গতিকে মন্থর করে তুলছে।
উৎসে কর কর্তন, রিটার্ন জমা, কর নির্ধারণী শুনানিতে অংশগ্রহণসহ নানাবিধ কাজে প্রতিদিন নানা পর্যায়ের করদাতা, আইনজীবী ও অন্যান্য লোকজন এসব অফিসে আসেন। কিন্তু এখানে এসে তাদেরকে যে ধরনের শারীরিক ও মানসিক ভোগান্তির শিকার হতে হয়, তা সত্যিই উদ্বেগজনক।
* কাঙ্ক্ষিত কর্মকর্তা বা সার্কেল খুঁজে বের করতেই একজন সেবাগ্রহীতার গুরুত্বপূর্ণ কয়েক ঘণ্টা নষ্ট হয়ে যায়।
* পার্টিশনহীন উন্মুক্ত ফ্লোরে অগুণতি মানুষের অবাধ বিচরণে গোপনীয় ফাইলপত্র খোয়া যাওয়া বা এলোমেলো হয়ে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি আছে।
* কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে শুনানির মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনি কার্যক্রম পরিচালনা করা খুবই কঠিন। এর ফলে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
বনানী কমপ্লেক্সের এই সংকটজনক পরিস্থিতির নেপথ্যে কয়েকটি মৌলিক সমস্যা চিহ্নিত করেছি, যা নিম্মরুপ :
১. নবসৃষ্ট দুটি কর অঞ্চলের সার্কেলসমূহের আয়তন ও জনবলের অনুপাতে পর্যাপ্ত জায়গা নির্ধারণ না করেই কার্যক্রম শুরু করা।
২. অফিস স্থানান্তরের আগে অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, কিউবিকেল বা পার্টিশন তৈরি না করা।
৩. প্রবেশমুখে বা ফ্লোরে সার্কেলভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র বা দিকনির্দেশক চার্ট না থাক
৪. প্রশাসনিক বিন্যাসের ক্ষেত্রে এনবিআর ও স্থানীয় কর কমিশনার কার্যালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও পূর্বপ্রস্তুতির অভাব।
চট্টগ্রামের এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ কর অঞ্চলের অচলাবস্থা নিরসন এবং একটি কার্যকর, আধুনিক ও করদাতা বান্ধব দাপ্তরিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ জরুরী:
* কর অঞ্চল-৫ এবং কর অঞ্চল-৬ এর জন্য অবিলম্বে স্বতন্ত্র স্পেস বা নতুন ভবন বরাদ্দ করতে হবে, যাতে সার্কেলগুলোকে পৃথকভাবে সাজানো যায়।
* বর্তমান স্পেসেই দ্রুততম সময়ে গ্লাস বা উডেন পার্টিশনের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের পৃথক কক্ষ এবং কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট ডেক্স বা কিউবিকেল তৈরি করা প্রয়োজন।
* ৮ তলার প্রবেশমুখে একটি দৃশ্যমান ইনফরমেশন ডেক্স বা তথ্যকেন্দ্র স্থাপন এবং প্রতিটি সার্কেলের সীমানা ও কর্মকর্তার নামফলক স্পষ্ট করে টাঙানোর ব্যবস্থা করা।
* সেবাগ্রহীতারা যাতে সহজেই বুঝতে পারেন কোন কাজের জন্য কার কাছে যেতে হবে, সেজন্য ফ্লোরের দৃশ্যমান স্থানে হালনাগাদ সিটিজেন চার্টার টাঙানো।
* ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফাইল ট্র্যাকিং ও অনলাইন সেবার পরিধি বৃদ্ধি করা, যাতে ফিজিক্যাল প্রেজেন্স বা সশরীরে উপস্থিতির প্রয়োজন কমে আসে।
পরিশেষে, রাজস্ব আহরণ কেবল সরকারি নির্দেশ জারি বা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের বিষয় নয়; এটি একটি সুষ্ঠু ও সম্মানজনক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল।
যে কর কর্মকর্তা রাষ্ট্রের রাজকোষ সমৃদ্ধ করতে নিরলস কাজ করেন, তাকে ন্যূনতম কাজের পরিবেশ দেয়া রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
একইভাবে, যে করদাতা রাষ্ট্র গঠনে অর্থ দিয়ে অবদান রাখছেন, তাকে একটি সুশৃঙ্খল ও সম্মানজনক সেবামূলক পরিবেশ দেয়াও আতিথেয়তার অংশ।
শেখ মুজিব রোডস্থ বনানী কমপ্লেক্সের ৮ তলার বিদ্যমান চিত্রটি অবিলম্বে সংস্কার করা না হলে নবসৃষ্ট কর অঞ্চল দুটি গঠনের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। আশা করা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে একটি আধুনিক, সুশৃঙ্খল ও কর্মবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
কর অঞ্চল ৫ ও ৬ এর লেখক
কবি, লেখক ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা
মন্তব্য করুন