চট্টগ্রাম নিউমার্কেট—শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে কেনাকাটা করতে আসেন। কিন্তু বর্তমানে বিপণিবিতানের চারপাশে হকারদের রঙিন ছাতি ও অস্থায়ী দোকানে এমনভাবে ঘেরা যে, স্বাভাবিক চলাচলই কঠিন হয়ে পড়েছে।

এটি শুধু নিউমার্কেট ব্যবসায়ীদের সমস্যা নয়; এটি এখন ক্রেতা, পথচারী এবং সামগ্রিক নগর ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।

মার্কেটের বৈধ ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ভ্যাট, আয়কর, ট্রেড লাইসেন্স ফি, দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিলসহ নানা ধরনের ব্যয় বহন করেন। ব্যবসা পরিচালনার জন্য তাঁদের নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। অথচ তাঁদের দোকানের সামনে ও আশপাশে যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে অস্থায়ী ব্যবসা পরিচালিত হয়, তাহলে বৈধ ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবেই অর্থনৈতিক চাপ ও ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়েন।

একজন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর প্রশ্ন—“আমরা রাষ্ট্রকে নিয়মিত কর ও ফি দেব, কিন্তু আমাদের ব্যবসার জায়গা ও ক্রেতাদের চলাচল সুরক্ষিত থাকবে না—এটা কি ন্যায়সংগত?”

অন্যদিকে হকাররাও সমাজেরই অংশ। তাঁদের জীবিকার বিষয়টিও মানবিকভাবে বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু জীবিকার প্রয়োজনের সঙ্গে নগরের শৃঙ্খলা, পথচারীর অধিকার এবং বৈধ ব্যবসায়ীদের স্বার্থের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।

 

 

আমরা হকার উচ্ছেদ চাই না; চাই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা ও নির্দিষ্ট স্থান। ফুটপাত পথচারীর জন্য, মার্কেটের প্রবেশপথ ক্রেতাদের জন্য এবং বৈধ দোকান বৈধ ব্যবসার জন্য—এই মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও নিউমার্কেট ব্যবসায়ীরা এখনো একটি কার্যকর ও স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছেন। জনপ্রতিনিধিদের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। আশ্বাসের পরও যদি বাস্তব পরিবর্তন না আসে, তাহলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা তৈরি হয়।

আজ তাঁদের প্রশ্ন—“আমরা কার কাছে গেলে সমস্যার সমাধান হবে?”

নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীরা কোনো সংঘাত চান না। তাঁরা হকারদের সঙ্গে বিরোধেও যেতে চান না। তাঁরা শুধু চান, একটি নিয়মতান্ত্রিক ও পরিচ্ছন্ন বাণিজ্যিক পরিবেশ—যেখানে ব্যবসায়ী ব্যবসা করবেন, হকার নির্ধারিত জায়গায় জীবিকা নির্বাহ করবেন এবং ক্রেতা স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করতে পারবেন।

একই সঙ্গে ক্রেতাদেরও প্রশ্ন আছে। মার্কেটে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে অতিরিক্ত ভিড়, ফুটপাত দখল, চলাচলে বাধা এবং যানজট—এসব ভোগান্তির দায় কে নেবে?

চট্টগ্রাম কি একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও ব্যবসাবান্ধব নগরী হতে পারে না?

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে নগর ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রামও পিছিয়ে থাকতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, সিডিএ, জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও হকার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

সরকারপ্রধান, অর্থ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট নগর কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি—বিষয়টিকে ছোট কোনো ব্যবসায়িক বিরোধ হিসেবে না দেখে নগর ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক অধিকারের বিষয় হিসেবে দেখুন।

আমরা কর দিতে চাই। নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে চাই। শহরের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে চাই। বিনিময়ে আমরা শুধু চাই—আমাদের ব্যবসার অধিকার, ক্রেতাদের চলাচলের অধিকার এবং একটি সুন্দর নগরের অধিকার নিশ্চিত করা হোক।

হকারদের জীবিকার অধিকার থাকবে, ব্যবসায়ীদের ব্যবসার অধিকার থাকবে, আর সাধারণ মানুষের থাকবে নিরাপদ ও স্বাভাবিক চলাচলের অধিকার—এই তিনের সমন্বয়েই হতে পারে একটি মানবিক ও সুন্দর চট্টগ্রাম।

জবাব চাই—কাউকে উচ্ছেদ করার জন্য নয়, একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য।

নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী ও ক্রেতা সাধারণের কষ্টের কথাটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি শুনবেন?

Facebook Comments Box