উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিপদগ্রস্ত একদল তরুণ ক্রমেই নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিনের হতাশা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য, পারিবারিক চাপ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাবের পাশাপাশি সহজলভ্য স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার তাদের একটি অংশকে অনলাইন জুয়ার ফাঁদে ঠেলে দিচ্ছে।
অনলাইন জুয়ায় অর্থ হারিয়ে কেউ কেউ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে; পরবর্তী সময়ে অর্থের প্রয়োজন মেটাতে অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও রয়েছে।
মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন ক্যাম্পের পাশাপাশি উখিয়া, টেকনাফ ও কক্সবাজারের কিছু এলাকায় অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঘটছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিশেষ করে উঠতি বয়সী ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণদের একটি অংশ সস্তা ও অবৈধভাবে পাওয়া স্মার্টফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে জড়িয়ে পড়ছে।
অনলাইন জুয়া, অর্থের লোভ এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কিছু তরুণ চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, চুরি, প্রতারণা, ছিনতাই ও সহিংসতার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীও হতাশাগ্রস্ত ও অর্থকষ্টে থাকা তরুণদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে।
ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধের পাশাপাশি কক্সবাজার অঞ্চলে মাদক ব্যবসার বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

ইয়াবা, গাঁজা ও বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যের কেনাবেচায় তরুণদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে অর্থনৈতিক সংকট ও প্রতারণার শিকার কিছু নারী দালালচক্রের মাধ্যমে হোটেল, রিসোর্ট, মোটেল ও বাসাবাড়িতে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ক্যাম্পের অপরাধপ্রবণতার প্রভাব আশপাশের স্থানীয় জনপদেও পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এমনকি কিছু অভিভাবক সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
শিশু ও তরুণদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক অসহযোগিতা, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সংকট, নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাকে রোহিঙ্গা তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহজে অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা, গোষ্ঠীভিত্তিক সংঘাত, অস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং স্থানীয় অপরাধীদের দ্বারা তরুণদের বিভিন্ন অপকর্মে ব্যবহার।
ক্যাম্পগুলোতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহারও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। দায়িত্বশীলদের মতে, প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি এর অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
ক্যাম্পে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার নিরাপত্তায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই/পিবিএন—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবহৃত সংক্ষিপ্ত নাম অনুযায়ী) সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল ও লজিস্টিক সহায়তা বাড়ানো জরুরি। ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, ক্যাম্পের অনিরাপদ পরিবেশ, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং বিভিন্ন সামাজিক সংকটের কারণে তরুণদের একটি অংশ সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিকল্প নেই। মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে নিজ দেশে ফিরতে না পারায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ও হতাশা বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক কাঠামোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
কক্সবাজারের বাসিন্দারা রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সংস্থা, আঞ্চলিক জোট এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আরও কার্যকর ও আন্তরিক ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, তরুণদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, মানসিক সহায়তা ও বৈধ জীবিকার সুযোগ তৈরির উদ্যোগও প্রয়োজন
মন্তব্য করুন