‘ভাই, সালাম—কেমন আছেন?’
হঠাৎ রাস্তায় অপরিচিত কারও এমন সম্ভাষণ। এরপর—‘চিনতে পারছেন না?’, ‘আপনার অমুকের সঙ্গে তো আমার পরিচয় আছে’, কিংবা ‘একটু দাঁড়ান, কথা আছে।’

সৌজন্যবোধ থেকে পথচারী দাঁড়িয়ে গেলেন। শুরু হলো কথাবার্তা। কিন্তু কয়েক মিনিট পরই দেখা গেল, মোবাইল ফোন নেই, মানিব্যাগ উধাও, ব্যাগের গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্রও নেই। কখনো আবার ভুক্তভোগীকে নানা কথায় ব্যস্ত রেখে তার সঙ্গে থাকা অর্থ বা মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

নগরজীবনে প্রতারণার এমন কৌশলকে অনেকেই পরিচিত ভাষায় ‘সালাম পার্টি’ বলে থাকেন।

প্রথম ধাপ—অপরিচিত হয়েও পরিচিত হওয়ার অভিনয়

এ ধরনের প্রতারণার ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষ্য থাকে ভুক্তভোগীর মনোযোগ কেড়ে নেওয়া। হঠাৎ সালাম, পরিচিত হওয়ার দাবি কিংবা কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করা হতে পারে।

ভুক্তভোগী যখন মনে করার চেষ্টা করেন—‘লোকটিকে কি সত্যিই চিনি?’—তখনই তার স্বাভাবিক সতর্কতা কিছুটা কমে যেতে পারে।

দ্বিতীয় ধাপ—কথার জালে ব্যস্ত রাখা

এরপর শুরু হয় নানা প্রশ্ন ও কথাবার্তা। কেউ পারিবারিক খবর জানতে চায়, কেউ ব্যবসা বা চাকরির কথা বলে, আবার কেউ পুরোনো পরিচয়ের গল্প তৈরি করে।

কখনো একজন কথা বলে মনোযোগ ধরে রাখে, অন্য কেউ আশপাশে অবস্থান নেয়। ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি, অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা কিংবা অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগও কাজে লাগানো হতে পারে।

তৃতীয় ধাপ—বিভ্রান্তি তৈরি

প্রতারণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা। একাধিক ব্যক্তি একসঙ্গে কথা বলা, পথ আটকানো, দ্রুত প্রশ্ন করা কিংবা অপ্রত্যাশিত কোনো পরিস্থিতি তৈরি করার মাধ্যমে ভুক্তভোগীর মনোযোগ মূল ঘটনা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এই সময় ব্যাগ, পকেট, মোবাইল ফোন বা মানিব্যাগের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

একাকী চলাচলকারী ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ, ব্যস্ত সড়কে চলাচলকারী পথচারী কিংবা যারা প্রকাশ্যে টাকা-পয়সা বহন করেন—তাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তবে এমন প্রতারণার শিকার যে কেউ হতে পারেন। কারণ এর অন্যতম কৌশল হলো মানুষের স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ ও বিশ্বাসকে কাজে লাগানো।

‘চেনেন না?’—প্রশ্নের উত্তর কী হবে?

অপরিচিত কেউ পরিচিত হওয়ার দাবি করলে তাড়াহুড়া করে তার সঙ্গে কোথাও যাওয়া বা ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া ঠিক নয়।

ভদ্রভাবে বলা যেতে পারে—
‘আপনার নামটা বলুন, কোথায় পরিচয় হয়েছিল মনে করিয়ে দিন।’

পরিচয় পরিষ্কার না হলে কথোপকথন সংক্ষিপ্ত করে নিরাপদ ও জনসমাগমপূর্ণ স্থানে চলে যাওয়া ভালো।

কেউ ঘিরে ধরলে কী করবেন?

একাধিক ব্যক্তি অস্বাভাবিকভাবে ঘিরে ধরলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হতে হবে। নিজের মোবাইল, মানিব্যাগ ও ব্যাগ শক্তভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। প্রয়োজনে আশপাশের দোকানদার, নিরাপত্তাকর্মী বা পথচারীদের সহযোগিতা নিতে হবে।

কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো এবং সম্ভব হলে ঘটনাস্থল, সময় ও জড়িত ব্যক্তিদের চেহারা বা পোশাকের বর্ণনা মনে রাখার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ।

সচেতন থাকুন, কিন্তু সন্দেহপ্রবণ নয়

সালাম, সৌজন্য কিংবা পরিচিত হওয়ার চেষ্টা—এসব আমাদের সামাজিক জীবনের স্বাভাবিক অংশ। তাই প্রতিটি সালামকে সন্দেহের চোখে দেখা নয়; বরং অপরিচিত ব্যক্তির অস্বাভাবিক আচরণ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকাই মূল কথা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতারণা প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি জনসচেতনতা, দ্রুত অভিযোগের ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ।

একটি সাধারণ সালাম যেন কারও জন্য আতঙ্কের কারণ না হয়।
সৌজন্যের সুযোগ নিয়ে প্রতারণা নয়—নিরাপদ নগরজীবনের জন্য চাই সচেতনতা ও সতর্কতা।

সতর্ক থাকুন। অপরিচিতের পরিচয় যাচাই করুন। নিজের মূল্যবান সামগ্রী নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

Facebook Comments Box