মুসলিম রাষ্ট্রে রূপান্তরের ৯০০ বছর পূর্ণ হওয়ার ঐতিহাসিক দিনটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করেছে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। দীর্ঘ ঐতিহাসিক এই পথচলায় ইসলামি মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের লালন এবং বিকাশের বিষয়টিকে স্মরণ করে দেশটিতে নানা কর্মসূচি পালিত হয়।
দেশটিতে ইসলাম আগমনের ঐতিহাসিক ঘটনা ৫৪৮ হিজরি বা ১১৫৩ খ্রিস্টাব্দের বলে প্রচলিত। এ উপলক্ষে রোববার দেশজুড়ে ধর্মীয় আলোচনা, খুতবা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
মালদ্বীপে ইসলাম আগমনের ৯০০ হিজরি বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশজুড়ে বিভিন্ন আয়োজন করা হয়েছে। প্রায় নয় শতাব্দী ধরে দেশটির মানুষের জীবন ও পরিচয়ের সঙ্গে ইসলাম গভীরভাবে জড়িয়ে থাকার স্মরণে এসব আয়োজন করা হয়।
রোববার আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু। দেশটির বিভিন্ন স্থানে খুতবা, ধর্মীয় আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ইসলাম আগমনের ঐতিহাসিক ঘটনাটি স্মরণ করা হয়। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ৫৪৮ হিজরি বা ১১৫৩ খ্রিস্টাব্দে মালদ্বীপে ইসলাম আগমন করে।
এ উপলক্ষে হুলহুমালেতে সুলতান মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ গ্র্যান্ড মসজিদ ও ইসলামী সভ্যতা কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। দেশটির ইসলামী যুগের সূচনার সঙ্গে যার নাম জড়িত, সেই শাসকের নামেই কেন্দ্রটির নামকরণ করা হয়েছে।
ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি প্রধানত বৌদ্ধ দ্বীপরাজ্য কীভাবে বিশ্বের অন্যতম ইসলামপ্রভাবিত সমাজে পরিণত হলো?
বৌদ্ধ রাজ্য, মুসলিম বাণিজ্যপথ
মালদ্বীপে ইসলাম আগমনের অনেক আগে থেকেই মানুষের বসবাস ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ের অধিবাসীরা মূলত ভারতীয় উপমহাদেশ ও শ্রীলঙ্কা থেকে সেখানে গিয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধধর্ম দ্বীপপুঞ্জটির প্রধান ধর্মে পরিণত হয় এবং কয়েক শতাব্দী ধরে মানুষের জীবন ও সমাজে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে। বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার, স্তূপ ও অন্যান্য স্থাপনা।
ভারত মহাসাগরের বিশাল সামুদ্রিক বাণিজ্যব্যবস্থার মধ্যেও মালদ্বীপের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আরব ও পারস্যের মুসলিম বণিকরা ক্রমেই উপসাগরীয় অঞ্চল ও আরব উপদ্বীপের সঙ্গে পূর্ব আফ্রিকা, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগকারী সমুদ্রপথে যাতায়াত বাড়াতে থাকেন।
মালদ্বীপ বিশেষভাবে কড়ি শামুকের জন্য পরিচিত ছিল। বিপুল পরিমাণ কড়ি শামুক দেশটি থেকে রপ্তানি হতো এবং এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। শুকনো টুনা মাছ, নারকেল এবং নারকেলের আঁশ থেকে তৈরি ছোবড়াও ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপণ্য।
আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম আগমনের আগেই মুসলিমদের সঙ্গে মালদ্বীপের যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল।
রাজা ধোভেমি থেকে সুলতান মুহাম্মদ
মালদ্বীপের প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১১৫৩ সালে দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। ওই সময় রাজা ধোভেমি বৌদ্ধধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মুসলিম নাম ও উপাধি হিসেবে সুলতান মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ গ্রহণ করেন।
তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি আবু আল-বারাকাত ইউসুফ আল-বারবারি নামে এক আগন্তুক মুসলিম আলেম ও ইসলাম প্রচারকের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রচলিত রয়েছে। তবে আবু আল-বারাকাতের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
আল-বারবারি উপাধির কারণে ঐতিহ্যগতভাবে ধারণা করা হয়, তিনি উত্তর আফ্রিকার একজন বারবারি, সম্ভবত মরক্কোর বাসিন্দা ছিলেন। আবার সোমালি ঐতিহ্যেও তাকে নিজেদের বলে দাবি করা হয়েছে। অন্য একটি ঐতিহাসিক মত অনুযায়ী, ওই ইসলাম প্রচারক ছিলেন ইউসুফ শামসুদ্দীন আত-তাবরিজি, যার মাধ্যমে তার পারস্য বংশোদ্ভূত হওয়ার ধারণা পাওয়া যায়।
আবু আল-বারাকাতের সঠিক পরিচয় যা-ই হোক, তার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজা ধোভেমির ইসলাম গ্রহণের ঘটনা মালদ্বীপে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ভিত্তিগত কাহিনি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
ধোভেমি ইসলাম গ্রহণের পর পুরো দ্বীপপুঞ্জে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে এবং বৌদ্ধ রাজতন্ত্র মুসলিম সালতানাতে রূপান্তরিত হয়। পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে বিভিন্ন রাজবংশের উত্থান-পতন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মুসলিম রাজবংশগুলো মালদ্বীপ শাসন করে।
রান্নামারি দানবের ভয়!
মালদ্বীপের ইসলাম গ্রহণের ইতিহাসের সঙ্গে একটি বিখ্যাত অতিপ্রাকৃত কাহিনিও জড়িয়ে আছে। চতুর্দশ শতকে মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা মালদ্বীপ সফর করেন। তিনি সে সময় স্থানীয় একটি কাহিনি লিপিবদ্ধ করেন। এতে বলা হয়, একসময় দ্বীপবাসীরা রান্নামারি নামে এক সামুদ্রিক দানবের ভয়ে বসবাস করত।
কাহিনি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময় পরপর একটি তরুণীকে ওই প্রাণীর কাছে উৎসর্গ করা হতো। একসময় এক আগন্তুক মুসলিম ব্যক্তি ওই দানবের মোকাবিলা করেন। তিনি রাতে কোরআন তিলাওয়াত করতে করতে সেখানে অবস্থান করেন। এরপর দানবটি আর ফিরে আসেনি। ঘটনাটি দেখে রাজা মুগ্ধ হন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।
তবে এই কাহিনিকে মালদ্বীপের ইসলাম গ্রহণের আক্ষরিক ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। কিন্তু ইবনে বতুতা ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তাই তা গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলাম আগমনের প্রায় দুই শতাব্দী পর মালদ্বীপের মানুষের স্মৃতিতে একজন বিদেশি মুসলিমের সঙ্গে দেশটিতে ইসলাম আগমন সম্পর্কিত একটি কাহিনি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল।
ইবনে বতুতা মালদ্বীপে কয়েক মাস অবস্থান করেন এবং একজন কাজি বা ইসলামী বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মধ্যযুগের মালদ্বীপের মুসলিম সমাজ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বিবরণগুলোর একটি তার লেখায় পাওয়া যায়।
ইসলাম ও মালদ্বীপ
পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে ইসলাম মালদ্বীপের সংস্কৃতি, শাসনব্যবস্থা ও স্থাপত্যের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে গেছে।এর অন্যতম স্বতন্ত্র নিদর্শন হলো দ্বীপপুঞ্জের ঐতিহাসিক মসজিদগুলো। এসব মসজিদ খোদাই করা প্রবালপাথর দিয়ে নির্মিত। দেশটির সামুদ্রিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই স্থাপত্যরীতি বিশেষ বৈশিষ্ট্য বহন করে।
আধুনিক মালদ্বীপের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম। দেশটির জাতীয় ও সাংবিধানিক পরিচয়েও ইসলামের আনুষ্ঠানিক অবস্থান রয়েছে।
এ বছরের আয়োজনের মাধ্যমে নয় শতাব্দী আগে রাজা ধোভেমির ইসলাম গ্রহণের সেই ঘটনাকে মালদ্বীপের বর্তমান জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
সূত্র: নিউ আরব
মন্তব্য করুন