শিশুর পৃথিবী খুব ছোট। সেই ছোট পৃথিবীতে মায়ের কণ্ঠ, স্পর্শ, আদর আর সাড়া দেওয়ার ধরনই অনেক সময় হয়ে ওঠে তার নিরাপত্তার প্রথম পাঠ। ভয় পেলে মায়ের কাছে ছুটে যাওয়া, কাঁদলে মায়ের কোলে শান্ত হওয়া, নিজের আনন্দের কথা মাকে বলতে চাওয়ার মুহূর্তের মধ্য দিয়েই শিশুর মনে তৈরি হতে থাকে সম্পর্ক সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা।

মনোবিজ্ঞানে এই আবেগীয় বন্ধনকে বলা হয় ‘অ্যাটাচমেন্ট’ বা সংযুক্তি। শিশুর প্রয়োজনের সময়ে একজন পরিচর্যাকারী কতটা সংবেদনশীলভাবে সাড়া দিচ্ছেন, তার ওপর এই সম্পর্কের ধরন গড়ে উঠতে পারে। নিরাপদ ও স্থিতিশীল যত্ন পেলে শিশুর মধ্যে ‘সিকিউর অ্যাটাচমেন্ট’ বা নিরাপদ সংযুক্তি গড়ে ওঠার সুযোগ থাকে। তখন সে ধীরে ধীরে শিখতে পারে-প্রয়োজনে অন্যের সাহায্য চাওয়া যায়, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা যায় এবং কাছের মানুষকে বিশ্বাস করা সম্ভব।

শিশু যখন তার প্রয়োজনের সময়ে মায়ের কাছ থেকে নিয়মিত যত্ন, সাড়া ও মমতা পায়, তখন তার মধ্যে নিরাপদ সংযুক্তি বা ‘সিকিউর অ্যাটাচমেন্ট’ গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। এতে শিশু বুঝতে শেখে, বিপদে পড়লে সাহায্য চাওয়া যায়, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা যায় এবং প্রয়োজন হলে আবার নিজের মতো করে পৃথিবীটাকে অন্বেষণ করাও সম্ভব।

অন্যদিকে, শিশুর আবেগীয় প্রয়োজন বারবার উপেক্ষিত হলে কিংবা তার যত্নের অভিজ্ঞতা যদি অনিয়মিত বা অনিরাপদ হয়, তাহলে অনিরাপদ সংযুক্তির কিছু বৈশিষ্ট্য তৈরি হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে শৈশবের অভিজ্ঞতা একজন মানুষের ভবিষ্যৎকে অবধারিতভাবে নির্ধারণ করে দেয়। পরবর্তী জীবনের সম্পর্ক, সামাজিক পরিবেশ ও নানা ইতিবাচক অভিজ্ঞতাও মানুষের সম্পর্কের ধরন বদলাতে পারে।

মায়ের কাছে নিরাপত্তার প্রথম পাঠ

একটি শিশু যখন ভয় পায় কিংবা বিপন্ন বোধ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সে পরিচিত ও নিরাপদ মানুষের কাছে যেতে চায়। মা যদি সেই সময়ে শিশুর কান্না, ভয় বা অস্বস্তিকে গুরুত্ব দেন, তাহলে শিশু ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে যে তার অনুভূতিগুলো মূল্যহীন নয়।

এই অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তী সময়ে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে। বড় হয়ে মানুষ বন্ধুত্ব, ভালোবাসা কিংবা জীবনসঙ্গীর সম্পর্কে যে ধরনের নিরাপত্তা, আস্থা ও মানসিক সমর্থন খোঁজে, তার সঙ্গে শৈশবের সম্পর্কের যোগ থাকতে পারে।

সংকটে আশ্রয় খোঁজার অভ্যাস

শিশুরা যখন ভয়, অসহায়ত্ব বা মানসিক চাপ অনুভব করে, তখন পরিচিত ও নিরাপদ ব্যক্তির কাছাকাছি যেতে চায়। শৈশবের এই অভিজ্ঞতাগুলো ধীরে ধীরে তার মনে তৈরি করে-কাকে বিশ্বাস করা যায়, নিজের কষ্ট কীভাবে প্রকাশ করতে হয় এবং অন্যের কাছ থেকে কী ধরনের সাড়া আশা করা যায়।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ও মানসিক আশ্রয়ের প্রয়োজন পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। বরং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে মানুষ অনেক সময় সেই নিরাপত্তা, বোঝাপড়া ও সমর্থন প্রত্যাশা করে। তাই শৈশবে গড়ে ওঠা সম্পর্কের অভিজ্ঞতা পরবর্তী ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

যে শিশু নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছে এবং প্রয়োজনের সময় সাড়া পেয়েছে, বড় হয়ে তার নিজের আবেগ ও অন্যের আবেগ বোঝার ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা থাকতে পারে। বিপরীতে, শৈশবে বারবার প্রত্যাখ্যান, অনিশ্চয়তা বা অবহেলার অভিজ্ঞতা থাকলে কারো মধ্যে অতিরিক্ত আশ্বাসের প্রয়োজন, সম্পর্ক হারানোর ভয় কিংবা ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

নিরাপদ সম্পর্ক মানেই নিখুঁত মা হওয়া নয়

সন্তানের সঙ্গে নিরাপদ সম্পর্ক গড়ে তুলতে মাকে নিখুঁত হতে হবে না। বরং শিশুর কথা শোনা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ভুল হলে সম্পর্ক মেরামত করার চেষ্টা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু কিছু বলতে এলে সম্ভব হলে কাজ থামিয়ে তার দিকে মনোযোগ দিন। ব্যস্ত থাকলে সরাসরি বলতে পারেন, ‘এখন পাঁচ মিনিট তোমার কথা শুনব, তারপর আমাকে কাজটা শেষ করতে হবে।’ এতে শিশু যেমন গুরুত্ব পাওয়ার অনুভূতি পায়, তেমনই ধীরে ধীরে সময় ও সীমারেখার ধারণাও শেখে।

সন্তানের ব্যক্তিগত পরিসর বা প্রাইভেসিকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। একই সঙ্গে মায়ের নিজেরও ব্যক্তিগত সময়, বিশ্রাম, শখ ও নিজস্ব জগৎ থাকা প্রয়োজন। সুস্থ সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তিই হলো পারস্পরিক সম্মান ও স্বাস্থ্যকর সীমারেখা।

সন্তানকে নিজের মতো হতে দিন

প্রতিটি শিশুর স্বভাব, আগ্রহ ও সক্ষমতা আলাদা। তাই অন্য শিশুর সঙ্গে বারবার তুলনা করা তার আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বরং সন্তানের নিজের আগ্রহ ও শক্তির জায়গাগুলো খুঁজে বের করতে সাহায্য করা উচিত।

কেউ পড়াশোনায় ভালো, কেউ ছবি আঁকতে ভালোবাসে, কেউ খেলাধুলায় দক্ষ, আবার কেউ হয়তো খুব ভালো গল্প বলতে পারে। সন্তানের বিশেষত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া তাকে নিজের পরিচয় সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।

তুলনা নয়, স্বকীয়তার স্বীকৃতি

একটি শিশুকে অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা করা তার আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ‘ওর মতো হও’ বলার বদলে তার নিজের শক্তি ও আগ্রহগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করা ভালো। মায়ের সঙ্গে মতবিরোধ হলে সন্তানের বক্তব্য শান্তভাবে শুনুন। সব সিদ্ধান্ত তার ইচ্ছামতো নিতে হবে এমন নয়, তবে তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া তাকে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখায়। বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও তার আত্মনির্ভরতা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

পৃথিবীর সব শিশু এক রকম নয়। কারো শেখার ধরন আলাদা, কারো আগ্রহ আলাদা, আবার কারো আবেগ প্রকাশের ধরনও ভিন্ন। তাই একই মাপকাঠিতে সবাইকে বিচার না করে শিশুর স্বকীয়তাকে সম্মান করা জরুরি।

সন্তানের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠে একদিনে নয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ যেমন: মন দিয়ে শোনা, প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া, সম্মান দেওয়া এবং ভালোবাসা প্রকাশের সমষ্টিতেই শিশু বুঝতে শেখে, ‘আমার একটি নিরাপদ জায়গা আছে।’ আর সেই অনুভূতিই তার আত্মবিশ্বাস, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ জীবনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।

মতের অমিল হলেও সম্পর্ক থাকে

সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের মতামত তৈরি হবে। তখন মায়ের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়াটাও স্বাভাবিক। সব সিদ্ধান্ত সন্তানের ইচ্ছামতো নিতে হবে এমন নয়। কিন্তু তার বক্তব্য মন দিয়ে শোনা এবং কেন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে তা বোঝানো সম্পর্ককে আরও স্বাস্থ্যকর করতে পারে।

একই সঙ্গে সন্তানের ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করাও জরুরি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের সময়, বন্ধু, আগ্রহ ও ব্যক্তিগত জায়গার প্রয়োজন বাড়বে। মায়েরও নিজের বিশ্রাম, শখ ও ব্যক্তিগত সময় থাকা স্বাভাবিক। সুস্থ সম্পর্কের জন্য ভালোবাসার পাশাপাশি প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান ও সীমারেখা।

সূত্র: আমেরিকান লাইব্রেরি অব মেডিসিন, ফাস্ট ওয়েব ফ্যামিলি, হিন্দুস্তান টাইমস

Facebook Comments Box