মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, সংকটের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা তৈরি এবং পরিবার ও কমিউনিটিতে মানবিক সহায়তার সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে সিডনিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে Standard Mental Health First Aid প্রশিক্ষণ।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত Carnes Hill Community Centre-এর Medium Function Room-এ এ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন Standard Mental Health First Aid Instructor তালাত মাহমুদ। উদ্যোগটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে Avion Care।
প্রশিক্ষণে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্ভাব্য লক্ষণ চিহ্নিত করা, সংকটের সময়ে একজন মানুষের সঙ্গে সংবেদনশীল ও বিচারহীনভাবে কথা বলা, মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তার দিকে এগিয়ে দেওয়ার বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের বাস্তবভিত্তিক ধারণা দেওয়া হয়।
শুধু মানসিক স্বাস্থ্য নয়, প্রয়োজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো
আয়োজকদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা অনেক সময় বাইরে থেকে দৃশ্যমান হয় না। একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করলেও তার ভেতরে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, একাকিত্ব, হতাশা বা অন্য কোনো সংকট থাকতে পারে। কেউ নীরব হয়ে যেতে পারেন, নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারেন, আবার কেউ স্বাভাবিক হাসিমুখে দৈনন্দিন জীবন চালিয়ে যেতে পারেন। তাই পরিবারের সদস্য, বন্ধু, প্রতিবেশী, সহকর্মী এবং কমিউনিটির মানুষের মধ্যে প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে শুধু মানসিক সংকট নয়—হঠাৎ অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, শারীরিক অক্ষমতা, বয়স্ক মানুষের অসহায়ত্ব কিংবা কোনো জরুরি পরিস্থিতিতেও প্রশিক্ষিত ও সচেতন কমিউনিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কমিউনিটি হতে পারে প্রথম সহায়তার জায়গা
একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল কমিউনিটিতে মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু আর্থিক সহযোগিতা নয়। প্রয়োজনের সময়ে একজন অসহায় মানুষের কথা শোনা, তাকে নিরাপদ স্থানে নেওয়া, পরিবারকে খবর দেওয়া, চিকিৎসা সহায়তার সঙ্গে যোগাযোগ করা কিংবা জরুরি সেবার ব্যবস্থা করাও মানবিক দায়িত্বের অংশ। এ ক্ষেত্রে First Aid সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান, জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে এবং কখন চিকিৎসক, অ্যাম্বুলেন্স বা অন্যান্য পেশাদার সেবার প্রয়োজন। এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কমিউনিটি পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাথমিক চিকিৎসা সহায়তা, কমিউনিটি ক্লিনিক, ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, অক্সিজেন ও নেবুলাইজিংয়ের মতো জরুরি চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য, পাশাপাশি হুইলচেয়ারসহ প্রয়োজনীয় সহায়ক সরঞ্জামের সহজলভ্যতা নিয়ে কাজ করা যেতে পারে। তবে এসব চিকিৎসা ও জরুরি সেবা অবশ্যই প্রশিক্ষিত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবন্ধী ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য সহায়ক কমিউনিটি
একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কমিউনিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ, অসুস্থ ব্যক্তি, একাকী বসবাসকারী এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে সমাজের মূলধারার অংশ হিসেবে দেখা। প্রয়োজনে হুইলচেয়ার, চলাচল সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে তথ্য, হাসপাতালে যাতায়াত, জরুরি যোগাযোগ কিংবা পরিবারের সঙ্গে সমন্বয়ের মতো ছোট ছোট উদ্যোগও একজন মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার সঙ্গে এ ধরনের সামাজিক সহায়তা যুক্ত হলে একটি কমিউনিটি আরও নিরাপদ, মানবিক ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে পারে।
সাহস, সচেতনতা ও সহমর্মিতা
প্রশিক্ষক তালাত মাহমুদ disability, vulnerable families এবং Mental Health First Aid বিষয়ে অভিজ্ঞতার আলোকে প্রশিক্ষণার্থীদের বিভিন্ন বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দেন। মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী না হয়েও কীভাবে প্রয়োজনের সময়ে একজন মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, সহমর্মিতা দেখানো, পরিস্থিতি বুঝে নিরাপদ সহায়তা দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা যায়—প্রশিক্ষণে এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ধরনের প্রশিক্ষণ মানুষের মধ্যে শুধু জ্ঞান নয়, সাহস, আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ তৈরি করতে পারে। সংকটে থাকা একজন মানুষকে ‘তুমি একা নও’—এই অনুভূতি দেওয়াও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সহায়তা হয়ে উঠতে পারে।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরি হতে পারে স্বেচ্ছাসেবী কমিউনিটি
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা গেলে জরুরি সময়ে মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো সহজ হতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগের আওতায় মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা, First Aid, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, প্রতিবন্ধী সহায়তা, বয়স্কদের সেবা, পরিবেশ সচেতনতা, ফিটনেস ও সুস্থ জীবনযাপন, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মানবিক সহায়তার বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ আয়োজন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কমিউনিটির তরুণদের স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে যুক্ত করা হলে তাদের মধ্যে নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধও বিকশিত হবে।

‘হেলপ’ হোক মানবিক কমিউনিটি কার্যক্রমের অংশ
কমিউনিটির অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে একটি সমন্বিত Help Network গড়ে তোলা যেতে পারে। যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবক, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, কমিউনিটি ক্লিনিক, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিবন্ধী সহায়তা এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। এ ধরনের নেটওয়ার্কে কেউ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সময় দিতে পারেন, কেউ চিকিৎসা-সংক্রান্ত জ্ঞান দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন, কেউ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা হুইলচেয়ার দিতে পারেন, আবার কেউ অসহায় মানুষের জন্য খাবার, প্রয়োজনীয় সামগ্রী বা অন্য কোনো সহায়তা পৌঁছে দিতে পারেন। অর্থাৎ ‘গিফট’ শুধু বস্তু দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। সময়, জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক সহযোগিতাও হতে পারে মূল্যবান উপহার।
ঝুঁকিমুক্ত মানবিক কার্যক্রম
মানুষের পাশে দাঁড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হলেও সহায়তা করতে গিয়ে নিজের জীবন বা নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা উচিত নয়।
দুর্ঘটনা, আগুন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা বা উদ্ধারকাজে না গিয়ে দ্রুত সংশ্লিষ্ট জরুরি সেবা ও পেশাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করাই নিরাপদ।
মানবিকতা তখনই কার্যকর হয়, যখন তা সচেতনতা, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিচালিত হয়।
পরিবেশ ও সুস্থ জীবনযাপনও কমিউনিটি সচেতনতার অংশ স্বাস্থ্যকর সমাজ গঠনে মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম ও ফিটনেস চর্চা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পরিচ্ছন্নতা, সবুজ পরিবেশ রক্ষা এবং প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ—সবকিছুই একটি সুস্থ কমিউনিটি গঠনের অংশ হতে পারে।
বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের মধ্যে খেলাধুলা, ফিটনেস, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
Blended Face-to-Face কোর্স
প্রশিক্ষণটি ছিল Standard Mental Health First Aid – Blended Face-to-Face কোর্সের অংশ।
ফেস-টু-ফেস সেশনে অংশগ্রহণের আগে অংশগ্রহণকারীদের নির্ধারিত self-paced eLearning সম্পন্ন করার প্রয়োজন ছিল।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলাকে স্বাভাবিক করা এবং সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কমিউনিটির সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করা এ ধরনের প্রশিক্ষণের অন্যতম লক্ষ্য। সিডনির বহুসাংস্কৃতিক সমাজে পরিবার ও কমিউনিটির পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সচেতনতা বাড়াতে এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবসময় বড় কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি মনোযোগী শ্রবণ, কখনো একটি ফোনকল, কখনো সঠিক সময়ে জরুরি সহায়তার সঙ্গে যোগাযোগ—এমন ছোট উদ্যোগই একজন মানুষের জন্য বড় সহায়তা হয়ে উঠতে পারে।
সচেতন, প্রশিক্ষিত, নিরাপদ ও মানবিক কমিউনিটি গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে এমন একটি সমাজ—যেখানে বিপদে কেউ একা থাকবে না এবং প্রয়োজনের সময়ে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে।
মন্তব্যসমূহ
cnazmul6@gmail.com
30 Sep 2026cnazmul6@gmail.com
মো.নাজমুল ইসলাম চৌধুরী
30 Sep 2026নিজেকে মানসিকভাবে গড়ে তুলতে হবে পরিবার ও সমাজের স্বাস্থ্যসেবায়।
মানবিক কমিউনিটি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জরুরি সেবা দেওয়াই প্রতিটি মানুষের আসল কাজ ।।
ধন্যবাদ ।
মন্তব্য করুন