একসময় জাপানের গ্রামীণ জনপদে বাঁশ ছিল অত্যন্ত মূল্যবান এক প্রাকৃতিক সম্পদ। ঘরবাড়ি নির্মাণ থেকে শুরু করে নানাবিধ গৃহস্থালি সামগ্রী—সবক্ষেত্রেই বাঁশের ব্যাপক কদর ছিল। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া, প্লাস্টিকের বহুমুখী ব্যবহার এবং গ্রামীণ জনপদে জনবল হ্রাসের ফলে একসময়ের সেই প্রদীপ্ত বাঁশবাগানগুলো ক্রমান্বয়ে অবহেলিত ও জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিত্যক্ত ও অবহেলিত বাঁশবাগানগুলোই জাপানে এক অভিনব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে

বাঁশ খুব দ্রুত বাড়ে এবং এর জন্য খুব বেশি যত্নের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদটিই একসময় জাপানের জন্য মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জাপানের বন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে দেশটিতে বাঁশবাগানের আয়তন ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার হেক্টর, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার হেক্টরে। এর বিশালতা বোঝাতে বলা যায়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের মোট আয়তনের দ্বিগুণেরও বেশি!

গ্রামগুলোতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং লোকবসতি কমে যাওয়ার কারণেই মূলত বাঁশবাগানগুলো এভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। একটি পরিসংখ্যান বলছে, নাগানো প্রদেশের একটি গ্রামে ১৯৭৭ সালে যেখানে মাত্র ০.২৬ হেক্টর বাঁশবাগান ছিল, বসতিহীন হওয়ার পর ২০১৪ সালে তা সাড়ে ১৩ গুণের বেশি বেড়ে ৩.৫২ হেক্টরে পরিণত হয়। এভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া বাঁশবাগান শুধু জীববৈচিত্র্যকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং ভূমিধসের ঝুঁকিও মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এমন একটি সংকটজনক পরিস্থিতিতে জাপানের কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছে। অব্যবহৃত এই বাঁশকে তারা এখন পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই সম্পদে পরিণত করছে। এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো ফুকুওকা প্রদেশের নিপ্পন কানরিউ ইন্ডাস্ট্রির তৈরি ‘কাগুয়া রোড’ নামের একটি বিশেষ সড়ক নির্মাণ উপকরণ।

জাপানি রূপকথার এক চরিত্রের নামে নামকরণ করা এই উপকরণটি তৈরি হচ্ছে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে। এখানে বাঁশের আঁশের সঙ্গে আগ্নেয়গিরির ছাই, ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড এবং পাহাড়ি বালু মেশানো হয়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে সাধারণ পিচঢালা রাস্তার পৃষ্ঠের তাপমাত্রা যেখানে প্রায় ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায়, সেখানে কাগুয়া রোডের তাপমাত্রা থাকে অন্তত ১৫ ডিগ্রি কম। এই বাঁশের আঁশ মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতেও সাহায্য করে। এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিটি এতটাই সাড়া ফেলেছে যে, আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে কোম্পানিটি তাদের উৎপাদন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করছে।বাঁশের আরেকটি যুগান্তকারী ব্যবহার দেখা যাচ্ছে মিয়াজাকি প্রদেশে। সেখানকার ইয়ামাতো ফ্রন্টিয়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠান বিনামূল্যে অরক্ষিত বাঁশবাগানগুলো কেটে পরিষ্কার করছে এবং সেই বাঁশ প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করছে ‘সাসা সাইলেজ’ নামের এক বিশেষ ধরনের পশুখাদ্য ও সার। বাঁশ গুঁড়া করে চিটাগুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা এই খাবারে প্রচুর পরিমাণে ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা গবাদিপশুর হজমশক্তি ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

খামারিরা জানিয়েছেন, এই খাবার খাওয়ানোর ফলে গরু বা ছাগলের দুধ ও মাংস উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি মাংসের মানও উন্নত হয়েছে। শুধু তাই নয়, সার হিসেবে ব্যবহারে ধান ও সবজির ফলনও বেড়েছে বহুগুণ। জাপানে বর্তমানে গবাদিপশুর খাদ্যের মাত্র ২০ শতাংশ নিজেরা উৎপাদন করতে পারে, বাকিটার জন্য তারা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। এক্ষেত্রে সাসা সাইলেজের ব্যবহার একদিকে যেমন আমদানি খরচ ও কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাচ্ছে, অন্যদিকে বাঁশবাগানগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করছে।

এমন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে স্থানীয় সরকার ও বিভিন্ন সংস্থাও এখন এগিয়ে আসছে। কোচি প্রদেশ সম্প্রতি বাঁশের বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করেছে। অন্যদিকে ওইতা প্রদেশ বনভূমি পুনরুদ্ধারে বাঁশ কাটা এবং চলাচলের রাস্তা তৈরির জন্য আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। পাশাপাশি কোবে শহরের প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় এবং নাগরিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে মিলে আগাছা দমনে বাঁশের ব্যবহার নিয়ে গবেষণামূলক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে সরকার, ব্যবসায়ী, গবেষক ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাঁশ এখন একটি আঞ্চলিক সমস্যা থেকে মূল্যবান জাতীয় সম্পদে পরিণত হচ্ছে।

প্রাকৃতিক সম্পদকে কেবল ফেলে না রেখে বা ধ্বংস না করে, কীভাবে চক্রাকার অর্থনীতি বা সার্কুলার ইকোনমির মাধ্যমে নতুন বাজার তৈরি করা যায়, জাপান আজ বিশ্বকে সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি সাম্প্রতিক শ্বেতপত্র ‘দ্য ফিউচার অব ম্যাটেরিয়ালস সিস্টেমস’-এ বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্বের ৯০ শতাংশেরও বেশি ব্যবসায়ী নেতা।

জাপানের এই মডেলটি বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও এক দারুণ অনুপ্রেরণা হতে পারে। অব্যবহৃত প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশ রক্ষা, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার এই পথ অনুসরণ করলে আগামী দিনের পৃথিবী নিঃসন্দেহে আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।

তথ্যসূত্র: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম

Facebook Comments Box